
দেশে-বিদেশে দিন দিন ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে।প্রাণঘাতী এই রোগের চিকিৎসা সব সময়ই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এখন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও, মূলত ওষুধের উচ্চমূল্য এবং সঠিক মেশিন ও তার ব্যবহারের অদক্ষতার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ক্যান্সারের চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য ও অনুপযুক্ত ।হাসপাতালগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসার কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই। ফলে আমাদের কোথায় কী প্রয়োজন, সেটা জানা যায় না। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মাত্র। বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। রেডিওথেরাপি সেন্টার থাকা উচিত ১৬০টি। আমাদের হয়তো আছে ১৫ থেকে ২০টি।ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি প্রতিষ্ঠানের মতে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য দুটি টেলি ও একটি ব্রাকিথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। এই হিসাবে শুধু ঢাকায় রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন হবে ২০টি আর সারা দেশের জন্য দরকার ৩০০টি। ক্যানসার চিকিৎসার সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি—এই তিনটি ধাপ রয়েছে। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে কেমোথেরাপির নামে যা দেয়া হচ্ছে তার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। সার্জারি ও রেডিওথেরাপি হাতে গোনা কয়েকটি হাসপাতালে রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশের কয়েকটি মেডিকেল কলেজ এবং বিশেষায়িত হাসপাতালে কোবাল্ট ও লিনিয়ার এক্সিলারেটর মিলিয়ে ১৬টি রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে। বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, আহসানিয়া মিশন ক্যন্সার হাসপাতালে রেডিওথেরাপির এই মেশিন যাকে বলা হয় লিন্যাক (Linear Accelerator) রয়েছে। সাম্প্রতিক কালে এপোলো হাসপাতাল চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় ল্যাব এইড এই ধরনের মেশিন বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করব তা হল লিন্যাক (Linear Accelerator) মেশিন। এই মেশিন কিভাবে একটি হাসপাতালে স্থাপন করতে হয় এবং কি কি ব্যবস্থা রাখতে হয় সেটি পরিচালনার জন্য সেটাও আলোচনা করব। মুলত এই মেশিনটি থেকে অত্যন্ত উচ্চ মানের রেডিয়েশন (এক্স রে এবং ইলেকট্রন) নির্গত হয় যা দিয়ে একজন ক্যান্সার পেশেন্ট এর শরীরে ক্যান্সার সেলগুলো সনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়। সাধারণত ক্যান্সার চিকিৎসার শেষ ধাপ হল এই রেডিয়েশন থেরাপি । যেহেতু এই মেশিন থেকে উচ্চমানের রেডিয়েশন নির্গত হয় তাই এই মেশিনটি ধারন করতে একটি বাংকার এর প্রয়োজন হয় যা মাটির নিচে হলে সবচেয়ে ভালো। তাই একটি হাসপাতাল ডিজাইনের যখন পরিকল্পনা হয় এবং সেখানে ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট একটি ডিপার্ন্টমেন্ট হয় সেক্ষেত্রে বেইজমেন্ট ( সেকেন্ড বেইজমেন্ট থেকে নিচের দিকে) ক্যান্সার ডিপার্টমেন্টের জন্য তৈরী করতে হয়। আরো খেয়াল রাখতে হয় যেন বাংকারের অবস্থান কোন জনবহুল রাস্তার পাশে না হয় সেটি মাটির যত নিচেই হোক না কেন । সাধারণত একটি হাসপাতালের এরিয়ায় মাঝামাঝি পজিশনে এই বাংকার থাকা উচিৎ। এখন আসি এই বাংকারটি কিভাবে ডিজাইন করা লাগবে সে আলোচনায়। মুলত এই বাংকার যুদ্ধাবস্থায় বাংকারের মতোই তৈরী করতে হয়। মেশিনটির সাইজ যা সাধারণত ৮ ফিট চওড়া ও ১৫ ফিট লম্বা হয় সেক্ষেত্রে বাংকারের ভেতরের ভলিউম কমপক্ষে ২০ ফিট চওড়া, ২৫ ফিট লম্বা আর ১৫ ফিট উচ্চতার হতে হয় যার দেয়ালের প্রস্ত হবে কমপক্ষে পাচ ফিট এবং এই দেয়াল অবশ্যই কংক্রিটের তৈরী হতে হবে। শুধু তাই নয়, এর ছাদের প্রস্থও পাচ ফিট এবং যে অংশ বরাবর রেডিয়েশন চালানো হবে সে বরাবর দশ ফিটের দেয়াল এবং ছাদ তৈরী করতে হবে। সাথে সেই অংশের ভেতরে মিনিমাম দুইশ মিলিমিটার চওড়া স্টীলের পাত বসানো থাকতে হবে যাতে কোনভাবেই রেডিয়েশন বাংকারের বাইরে আসতে না পারে। এই বাংকারের দরজা সরাসরি হবে না, একটি প্রশস্ত করিডর রেখে তারপর স্টীলের দরজা সংযুক্ত করতে হবে। মেশিনটি স্থাপনের জন্য যাতে বাংকার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সেজন্য বেইজমেন্টের একটি অংশের ছাদ উন্মুক্ত রাখা জরুরী। সাধারণ সিড়ি এমনকি হাসপাতাল বেড লিফটেও এই মেশিন বহন করা সম্ভব নয়। মেশিনের ইলেক্ট্রিক এবং কুলিং সিস্টেমের জন্য বাংকারের দেয়ালে আগে থেকে লাইন টেনে সেট করে ঢালাই দেয়া হয় এবং প্রশস্ত এই দেয়ালে লাইন টানার সময় তীর্যকভাবে টানা হয় যাতে এইসকল ওয়্যারিং পাইপের মধ্য দিয়ে রেডিয়েশন বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে। একটি লিন্যাক স্থাপনের জন্য শুধু বাংকারই সব কিছু নয় এর সাথে প্রোগ্রাম অনুযায়ী স্পেইস প্ল্যানিং সংযুক্ত। সাধাণত ব্র্যাকিথেরাপি (যদি থাকে), পেশেন্ট হোল্ডিং এরিয়া, মোল্ড রুম, রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের চেম্বার, কন্সাল্টেনেটের রুম, বোর্ড রুম, পেট স্ক্যান, পেট কনসোল, ডোজ এডমিন সহ আরো অনেক ফ্যাসিলিটি এই বাংকারের সাথে প্রয়োজন হয়। সাথে এই মেশিন ঠান্ডা রাখার জন্য আলাদা চিলার রাখতে হয় যা গ্রাউন্ডের সাথে সংযুক্ত থাকে। শেষে যে জিনিসটি বলতে চাই এবং বেশিরভাগ সময় যেটা মিস করে, পেশেন্টের জন্য আলাদা টয়লেট, সেই টয়লেটের জন্য আলাদা সেপটিক ট্যাংক, পাম্প রুম সংযুক্ত করতে হয় কারন পেশেন্টের মলমুত্রেও এই রেডিয়েশন থাকে এবং সেই রেডিয়েশন যদি কোনভাবে আমাদের সিটি সুয়ারেজ সিস্টেমে গিয়ে পড়ে তাহলে ভয়ংকর রকমের বিপদ হতে পারে।

Comentarios